স্টার্টআপ লোনের খুঁটিনাটি বিষয়

Share Now:

আভিধানিক অর্থে স্টার্টআপ হল নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ কিংবা বানিজ্যিক প্রকল্প। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের তরুনদের মধ্যে একটি জনপ্রিয় শব্দ হচ্ছে স্টার্ট আপ। এটি এমন একটি উদ্যোগ যেখানে নতুন আইডিয়ার সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিদ্যমান কোন সমস্যার অভিনব সমাধান করে একসঙ্গে অনেক মানুষকে পণ্য বা সেবা দেওয়ার। সাধারনত বেশিরভাগ স্টার্টআপে অর্থের যোগান বা বিনিয়োগ হয় উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠাতারা নিজেই। স্টার্টআপ ও ছোটব্যবসায়ের মধ্যে মূল পার্থক্য হল স্টার্টআপ বৃদ্ধির সম্ভবনা থাকে যেখানে ছোটব্যবসার ক্ষেত্রে নাও হতে পারে। যদিও সম্পদ, বিনিয়োগ ইত্যাদির কারনে স্টার্টআপের সূচনা করতে হয় ক্ষুদ্র পরিসর থেকে। এক্ষেত্রে স্টার্টআপ লোন অনেক উদ্যোগতাদের সাহায্য করতে পারে। 

Startup Loan কি?

যখন কোন একটি প্রতিষ্ঠান বাজারে নতুন কোন সেবা কিংবা নতুন কোন পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করার জন্য যে ঋণ নিয়ে থাকে তা স্টার্টআপ ঋণ( Startup Loan) নামে পরিচিত। নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন। নতুন ব্যবসায় একটি ব্যাংক বা ঋণদাতা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ এর সম্মুখীন হতে পারে। যেহেতু নতুন ব্যবসাগুলোর ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ক্রেডিট থাকে না, তাই ব্যাংক তাদের ব্যবসার ক্রেডিট বিবেচনা করে। ব্যাংকগুলি প্রায়ই স্টার্টআপ লোন অনুরোধ অস্বীকার করে কারণ ঋণগ্রহীতার ব্যক্তিগত ঋণ সমস্যা থাকতে পারে। শুধু আইডিয়া থাকলেই কেউ আপনার স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। নিজে কিছু একটা করে নিয়ে গেলে বরং মূলধন পাওয়া সহজ হয়।

Startup Loan কারা প্রদান করছে?

বাংলাদেশের চলমান সংস্কৃতিতে ব্যবসার ঋণের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম আকর্ষণের মাধ্যম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠিত কিংবা নতুন উভয় ধরনের ব্যবসার জন্যই বাংলাদেশের প্রায় সব ব্যাংকে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা আছে। এসএমই ফাউন্ডেশন বর্তমানে ৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তা ছাড়া অন্যান্য ব্যাংক নিজেদের নিয়মকানুনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মনীতিকে বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন খাতের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। আপনার উদ্যোগটি যে খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটির জন্য কোন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা উচিত প্রথমে একজন উদ্যোক্তাকে এ ব্যাপারে অবগত থাকা উচিত। এক্ষেত্রে কিছু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু সুবিধা সমূহ হলোঃ 

  • আইডিএলসি স্টার্টআপ লোন:  স্টার্টআপ লোন ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, ঋণ পরিশোধের সময় হচ্ছে: ৫ বছর।
  • বিনা জামানতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। টাকার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে।
  • মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ‘স্মল বিজনেস লোন সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্টার্টআপ লোন পাওয়া সম্ভব। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো জামানতের  প্রয়োজন হয় না। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৫ বছর, তবে ব্যবসাটির সময়কাল কমপক্ষে ১ বছর  হতে হবে এই ঋণ পাওয়ার জন্য ।
  • আইএফআইসি প্রান্ত নারী (উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর লোন): মুলত নারী উদ্যোগতাগন যারা ক্ষুদ্র এবং কুটিরশিল্পের সাথে জড়িত তাদের জন্য এই ঋণ দেয়া হয়। জামদানি, নকশি কাঁথা, বুটিক, বিভিন্ন হ্যান্ডিক্রাফট, বিউটি পার্লার, ক্যাটারিং সার্ভিস ইত্যাদি কাজের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত এবং ব্যাংকের অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা যারা পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এই বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। একজন নারী উদ্যোক্তাকে কমপক্ষে ২ বছর সেই ব্যবসাটির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে এই ঋণসুবিধা পাওয়ার জন্য। এটি হচ্ছে মূলত একটি টার্ম লোন। ইকুইটি  অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক: সফটওয়্যার, ফুড প্রসেসিং, অ্যাগ্রো-বেসড ইন্ডাস্ট্রির জন্য।
  • আইডিএলসি উদ্ভাবন লোন: সর্বনিম্ন ৫ লাখ, আনসিকিউরড লোন ২৫ লাখ, আংশিক সিকিউরড লোন সর্বোচ্চ ১ কোটি। সর্বনিম্ন ১৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৬০ মাস পর্যন্ত এই ঋণের মেয়াদ। যাঁরা বেসিসের সদস্য, তাঁরা এই ঋণ প্রাপ্তিতে বিশেষ সুবিধা পান এবং অগ্রাধিকার ও পান সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে ২ বছরের তবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১ বছরের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। উদ্যোক্তার বয়স হতে হবে ২০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।

এছাড়াও ব্যাংকের পাশাপাশি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারী প্রকল্প রয়েছে। 

ক্ষুদ্রঋণ

বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এনজিও, যেমন গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা বাংলাদেশ ইত্যাদি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের আওতায় ঋণ প্রদান করে থাকছে। তারা মূলত তৃণমূল পর্যায়ে এমন উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে, যাঁদের জন্য ক্ষুদ্রঋণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্টার্টআপের জন্য সরকারি প্রকল্প

বিভিন্ন সময় সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চলমান সমস্যা সমাধানের উপায় খোঁজে। তা ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্টার্টআপের জন্য মূলধন দেওয়ার সুযোগও পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা তাঁর আইডিয়াটি জমা দেন, তারপর কমিটি সেটি বিচার–বিশ্লেষণের পর গ্রহণ করলে তহবিল পাওয়া যায়। স্টার্টআপের অর্থায়নের জন্যে এ ধরনের সরকারি প্রকল্পগুলো বেশ কার্যকর। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রায়ই এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়। এছাড়া অন্য যে কোন উপায় অবলম্বন করে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।

Startup Loan কারা নিয়ে থাকছে?

সাধারণত নতুন উদ্যোক্তা ‍স্টার্টআপ ঋণের জন্য আবেদন করে থাকে। যদি উপযুক্ত ব্যবসার ধারনা এবং আশানুরূপ আয়ের সম্ভবনা থাকলে ব্যাংক লোন দিতে স্বীকৃতি জানাবে। এছাড়া যথাযথ জামানত ও জামিনদার থাকতে হবে। তবে ব্যবসায়ের প্রথম পর্যায়ে  উদ্যোক্তা সীমিত আকারে ঋণ পেয়ে থাকেন। এসএমই খাতে কতিপয় ব্যাংক কোলেটারেল ফ্রি (জামানতবিহীন) লোন চালু করেছে। এক্ষেত্রে আগ্রহী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা এবং নারী উদ্যোক্তাদের  অগ্রাধিকার বেশি দেওয়া হয়, তাই সম্পদ ব্যবসার জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলেও মূখ্য বিষয় নয়। সঠিক দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অগ্রসর না হলে তাতে বিনিয়োগের অনেক ক্ষতি হতে পারে। 

Startup Loanনেয়ার জন্য Eligibility/উপযোগিতাঃ  

  1. বাংলাদেশের একজন নাগরিক হতে হবে।
  2. আবেদনকারী ও গ্যারেন্টার উভয়েরই জাতীয় পরিচয়পত্র থাকনে হবে।
  3. আবেদনকারী ও গ্যারেন্টার উভয়েরই সদ্য তোলা রঙিন ফটোগ্রাফ থাকতে হবে।
  4. ব্যাংকের নিজস্ব ফরম সংগ্রহকরন এবং তা যথাযথভাবে পূরন করতে হবে।
  5. আপডেট ট্রেড লাইসেন্স এর ফটোকপি থাকতে হবে।
  6. ব্যবসায়ের টিন নম্বর থাকতে হবে।
  7. ইউটিলিটি বিল যেমন-গ্যাস বিল, ইলেকট্রিক বিল, টেলিফোন বিল ইত্যাদির ফটোকপি থাকতে হবে। 
  8. ফ্যাক্টরী স্থাপনার রেজিষ্ট্রেশন থাকতে হবে। (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
  9. ট্যাক্স ও ভ্যাট, কোয়ালিটি সার্টিফিকেশন থাকতে হবে।
  10. ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস রেজিষ্ট্রেশন থাকতে হবে।
  11. আবেদনকারীর সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন  (যেখানে শিল্পটি প্রতিষ্ঠা করা হবে) ও সম্পত্তি নেয়া হলে তার বৈধ চুক্তিনামা থাকতে হবে।
  12. ব্যাংকের হিসাব নাম্বার এবং জামানত স্থিতি থাকতে হবে।
  13. পৌরসভার বাসিন্দা হলে কমিশনারের সনদ। স্থানীয় পর্যায়ের হলে চেয়ারম্যান অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সনদ থাকতে হবে।.
  14. লিমিটেড কোম্পানি হলে মেমেরেন্ডাম এবং আর্টিক্যাল অব এসোসিয়েশনের কপি এবং অংশীদারী প্রতিষ্ঠান হলে অংশীদারী চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি থাকতে হবে।
  15. প্রতিষ্ঠান চালু থাকা অবস্থায় ঋণ গ্রহনে ইচ্ছুক হলে ব্যবসার ১ বছরের লাভ ক্ষতির হিসাব বিবরনী দেখাতে হবে।
  16. প্রতি ব্যাংকের ফর্মে উল্লেখযোগ্য একটি দিক রয়েছে যাকে লেটার অব গেরান্টি বলা হয়। এক্ষেত্রে আপনাকে  দুইজন যোগ্য গেরান্টারের সনদ প্রদানের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
  17. প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পূর্বে কোন ব্যাংক থেকে ঋণ করে থাকলে তার হিসাবের একটি হালনাগাদ ও যথাযথ বিবরন থাকতে হবে।

উপরের শর্তগুলো এবং তথ্য-উপাত্ত ব্যাংকে প্রদানের মাধ্যমে স্টার্ট-আপ ঋণের জন্য আবেদন করা সম্ভব। ব্যাংক এ সকল তথ্য উপাত্ত বিবেচনার মাধ্যমে আপনাকে ঋণ প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিবে। সহজেই স্টার্ট-আপ লোন সম্পর্কিত সকল বিস্তারিত তথ্য পেতে লগইন করুন অথবা ভিসিট করুন shongjogyou.com ওয়েবসাইটে।

Share Now: